Read more
“ খুব ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যায় এরপর থেকে মামা মামির সাথে থাকতাম । মাত্র বিশ বছর বয়সে তারা আমার বিয়ে দেয় একটা ২৮ বছরের লোকের সাথে । কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই সেই ছেলে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয় , আমি নাকি তার যোগ্য না । এরপর থেকে আমার নানু আমাকে তার কাছে নিয়ে যায় । এরপর এক বছরের মাথায় নানুও মারা যায় । নানু মারা যাওয়ার পর আর পড়াশোনা সম্ভব হচ্ছে না আবার তার উপর একটা ছোট বোনের দায়িত্ব তাই ছুটলাম চাকরির খোঁজে । ”
কথাটা বলার সাথে সাথে দু ফোঁটা চোখের পানি গঁড়িয়ে পড়ল মেহেকের চোখ থেকে । পাশে বসে থাকা অফিসের স্টাফ জিনিয়া বলল
“ চিন্তা করো না । এই চাকরিটা হতে পারে । তোমার রেজাল্ট ভালো । রেইন স্যার আবার রেজাল্ট দেখে , তার কাছে বয়স ম্যাটার করে না । ”
জিনিয়ার কথা শুনে মেহেক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশার স্বরে বলল
“ তাই যেন হয় । এমনিতেও বয়সের জন্য কোন জায়গাতেই টিকতে পারি নি । আর এইখানে তো দুই হাজার জনের মধ্যে একজন নিবে তাও পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট । জানি না কি হবে । ”
মেহেক আর জিনিয়ার কথার মাঝেই ডাক পড়লো মেহেকের । একরাশ ভয় আর নার্ভাস নিয়ে কেবিনের দরজায় নক করলো । ভেতর থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠে ভেসে এলো
“ কাম ইন । ”
মেহেক মনে সাহস জুগিয়ে , বুকে কয়েকবার ফুঁ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো । কেবিনের ঢুকতেই তার চোখে পড়লো এক যুবককে — রেইন ড্যাভিন , যে তার বিলাশবহুল চেয়ার উল্টো দিকে ঘুরিয়ে বসে আছে । মেহেক ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ডেস্কের দিকে । মেহেক যে দাঁড়িয়ে আছে সেটা রেইন খুব ভালোই বুঝতে পারছে তাই গম্ভীর কণ্ঠে আবার বলল
“ বসো । ”
মেহেক একটা চেয়ার টেনে বসলো । রেইন চেয়ার ঘুরালো মেহেকের দিকে —মেহেকও তাকালো রেইনের দিকে । হলদেটে ফর্সা ত্বক , বাদামি চোখ , ক্লিন সেভ করা মুখ আর স্পাইক করা চুল — কয়েকটা চুল কপালে এসে পড়েছে অগোচরেই । জিম করা ফোলা মাসালগুলো সাদা শার্ট ভেদ করে স্পষ্ট ফুটে রয়েছে । চেহারাটায় গম্ভীর ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে — কখনো হেসেছে কি না বোঝা দায় । বয়স হবে ২৯ বা ৩০ এর কাছাকাছি ।
মেহেক চোখ সরিয়ে নিচের দিকে তাকালো — নিজের হাতে থাকা ফাইলটা এগিয়ে দিলো কাঁপা কাঁপা হাতে । রেইন ফাইলটা নিয়ে চেক করতে করতে জিজ্ঞাসা করলো
“ নাম কি তোমার ? ”
মেহেকের সাবলীল উত্তর
“ এমিলি তেহজীব তুশ্মী। ডাকনাম মেহেক । ”
রেইন ফাইলের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বলল
“ একটা মানুষের এতগুলো নাম ! যাই হোক মাত্র একুশ বছর বয়সে জব কেন খুঁজছো ? ”
মেহেকের শ্বাস আটকে এলো । সবগুলো জব থেকে সে বয়সের জন্যই টিকতে পারে নি — এখন একমাত্র ভরসা এই বিখ্যাত কম্পানি ড্যাভিন ইন্ড্রাস্ট্রি । এইটাতেও না হলে আর বেঁচে থাকতে হবে না ।
মেহেক কয়েকবার আল্লাহর নাম পড়ে বলল
“ আমার বাবা-মা কেউ নেই স্যার , আর বাড়িতে তেমন কেউ নেই যে আমাদের ভড়নপোশনের দায়িত্ব নেবে তাই জব খুঁজতে বেরিয়েছি । স্যার আমার জবটা খুব প্রয়োজন । সব জায়গাতেই বয়সের জন্য আটকে গিয়েছি তাই আপনার কাছে এসেছি । ”
মেহেকের কথা শুনে রেইন তার অগোচরেই হালকা হাসলো হয়তো সেটা মেহেক দেখতে পায় নি । রেইন মেহেককে আরো কিছু প্রশ্ন করল আর মেহেকও খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে সেগুলোর জবাব দিলো । ইন্টারভিউ শেষে রেইন বলল
“ তুমি খুবই বুদ্ধিমতি । আই হোপ তুমি-ই আমার পিএ হও তবে আরো কয়েকজনের ইন্টারভিউ নেওয়া বাকি আছে । ”
রেইন একটু থেমে আবার বলল
“ তোমার জব হয়ে গেলে জানিয়ে দেওয়া হবে । এখন তুমি আসতে পারো ।”
মেহেক সালাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে । মেহেক বের হতেই রেইন একজন স্টাফকে ফোন দিয়ে কেবিনে আসতে বলল । কয়েক মিনিটের মধ্যে লোকটা চলেও এলো । রেইন আদেশ করে বলল
“ এমিলি তেহজীব তুশ্মীর জব কনফার্ম করো আর স্যালারি দুই লক্ষ করো । তবে ওকে কালকে জানাবে । ”
স্টাফ মাথা দুলিয়ে চলে গেল । রেইন নিজের চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলো চোখ বন্ধ করলো বাঁকা হেসে আওড়ালো
❝ কোন এক গোধূলি বিকেলে
আমি দেখেছিলাম তুমি হাসছিলে,
নাম দিয়েছিলাম তোমার ফিনিক্স পাখি
তুমিই সেই নারী , যে বাজিয়েছিলে আমার মনের ভায়োলিন । ❞
“ তুমি কি ভেবেছো মেহেক সোনা ! এতো সহজেই আমার মন চুরি করে পালাবে ! নো ওয়ে । তুমি হয়তো কোনদিন জানতেও পারবে না যে তোমাকে সবগুলো জব থেকে রিজেক্ট আমার কথায় করা হয়েছে । ”
কথাগুলো মনে মনে বলে রেইন ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে চেয়ারটা দুলিয়ে উঠলো ।
____________________________
রাস্তার একপাশে ড্যাভিন ইন্ডাস্ট্রির বড় এক অফিস আর ঠিক তার উল্টো পাশেই অস্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক কালো পোশাক পড়িহিতা অষ্টাদশী মেয়ে — অ্যামিলিয়া মেহেনুর তুশি । ফর্সা ত্বকটাও রোদের তীব্র আলোয় লাল বর্ণ ধারন করেছে । গা বেয়ে পড়ছে ঘাম । তুশি মূলত এখানে এসেছে তার বোনের সাথে ।
মেহেক বের হচ্ছে না দেখে তুশি অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো । যে-ই ভাবনা সেই কাজ — হাতে দুইটা বাবল-টি নিয়ে রাস্তা পাড় হতে যাবে অমনি একটা গাড়ি হর্ন দিয়ে উঠলো যেটা আগে থেকেই রাস্তার কিনারে পার্ক করা ছিলো । আকস্মিকভাবে হর্ন বাজায় তুশি ভয় পেয়ে যায় এবং হাতে থাকা বাবল-টি কিছু পড়ে যায় । তুশির রাগ আর দেখে কে ! হাতের বাবল-টি দুইটাই ছুঁড়ে মারে গাড়ির গ্লাস বরাবর — সাথে সাথেই গাঢ়ির ফ্রন্ট গ্লাসটা বাবল-টি দিয়ে নষ্ট হয়ে যায় ।
তুশির এমন কাজে রেগে গাড়ি থেকে বের হয় এক সুদর্শন যুবক — চোখে চশমা , মুখে মাক্স আর মাথায় ক্যাপ , হাতে কালো গ্লাভস্ । লং কোর্ট পড়া এই সুদর্শন যুবকটা এসে দাঁড়ায় তুশির সামনে । তুশির হাইট পাঁচ ফুট চার হওয়ার দরুন লোকটার বুক পর্যন্ত তার মাথা গিয়ে ঠেকেছে ।
“ এই যে মিস , এইটা আপনি কি করলেন ? ”
তুশি ভাবলেশহীনভাবে বলল
“ আপনি যেটা করলেন সেটার প্রতিশোধ নিলাম । ”
লোকটার গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল
“ তুমি জানো আমি কে ? ”
তুশি অবাক হওয়ার ভান করে বলল
“ আয়হায় , আপনার বাবা মা বলে নি আপনার পরিচয় ! খুবই দুঃখজনক ব্যাপার স্যাপার । থাক চিন্তা করবেন না আমি সাহায্য করবো আপনাকে। আমি আবার এতিম বাচ্চাদের সাহায্য করতে পছন্দ করি । ”
যুবকটা দমক দিয়ে বলল
“ চুপ বেয়াদব । আমি জেইন ড্যাভিন । সুপারস্টার জেইন ড্যাডিন আর তুমি আমার সামনে এইভাবে কথা বলছো । তুমি জানো ! এখন যদি আমার মাক্স খুলি তাহলে এখানে আমার শতশত ফ্যান হাজির হয়ে যাবে । ”
তুশি একবার জেইনের নিচ থেকে উপর পর্যন্ত পরখ করে দেখে বলল
“ জেইন ড্যাভিন আবার কে ? ”
জেইন যেনো আকাশ থেকে পড়লো । এই দেশে থাকে অথচ তাকে চিনে না ! এতো বড় সুপারস্টার সে , তার কত কত গান ভাইরাল অথচ এই মেয়ে তাকে চিনে না !
জেইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
“ রেইন ড্যাভিনকে চিনো ? ড্যাভিন ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র সিইও , আমি ওর ছোট ভাই । ”
তুশি ফিক করে হেসে দিলো । হাসতে হাসতে বলল
“ ভাইয়ের নামে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন ! হাস্যকর । ”
জেইন কিছু বলতে যাবে অমনি তুশি মেহেককে অফিস থেকে বের হতে দেখলো তাই জেইনকে থামিয়ে বলল
“ যাই হোক আপনাকে তো আমি দেখে নেবো । আজকের প্রতিশোধ পূরণ হয় নি আমার । ”
তুশি একটা মুখ ভেংচি দিয়ে চলে গেলো তার বোনের কাছে এই দিকে তুশির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে জেইন আনমনেই বলে উঠলো
“ ডিসগাস্টিং । ”
__________________________
দুইতলাবিশিষ্ট একটা বড় বাড়ি , তবে মেহেক আর তুশির জায়গা হয়েছে নিচ তলার একটা ছোট্ট রুমে । যদিও তাদের নামে অর্ধেক বাড়ি লেখা তবে মামা মামি দিতে নারাজ । মেহেক ভেবে রেখেছে , একবার শুধু পড়াশোনাটা শেষ হোক তারপর নিজের ভাগ বুঝে নিবে সে । তাই চুপচাপ মামা মামির অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছে ।
নিচ তলার কক্ষে বারান্দায় চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে মেহেক । রাত তখন দুইটার কাছকাছি , তুশি অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে । চাঁদটাও ঠিক মেহেকের মুখ বরাবর আলো দিচ্ছে । মেহেক গভীর চিন্তায় মগ্ন —তার জবটা নিয়ে । এই মাসে যদি জব না হয় তাহলে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে আর সামনে তো তুশির এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষা — ফী দিতে হবে । হাজার একটা চিন্তায় মেহেকের মাথা ফেঁটে যাচ্ছে । নিজের পড়াশোনার কথা বাদ , অন্তত বোনটাকে পড়াশোনা করাতে চায় সে ।
তবে এতো সবকিছুর মাঝেও মেহেক আল্লাহর কাছে কোনদিন অভিযোগ করে নি কিন্তু আজ অন্তঃগহীন থেকে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করে বসলো মেয়েটা । চোখ বন্ধ করে একটু শব্দ করে অভিমান করে বলল
“ আমার জীবনটাই কেন এমন বিষাদময় করে দিলেন আল্লাহ ? আমি কি সুখ পাওয়ার এতোটাই অযোগ্য ! প্রথমে তো বাবা-মাকে কেউ মেরে দিলো এরপর আমার বিয়ে হলো অথচ একদিনও সংসার করতে পারলাম না আবার এখন টাকার জন্য পড়াশোনা বন্ধ হতে নিচ্ছে । কি চাইছেন আপনি ? আমাকে তুলে নিতে ! তাহলে নিন , তা না হলে এই পৃথিবীতে থেকে মরন যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা দিন । ”
অভিযোগগুলো হয়তো উপরওয়ালা শুনলো !
মেহেক ডুকড়ে কেঁদে উঠলো — চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়লো ফর্সা গাল বেয়ে । মেহেক আর সেখানে বসলো না । উঠে চলে এলো রুমে , একটু ঘুমালে হয়তো ব্রেনটা রেস্ট পাবে ।
দূর থেকে একটা তীক্ষ্ম নজর এতোক্ষণ ধরে মেহেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলো। তার অঙ্গভঙ্গি , কান্না , অভিযোগগুলো — সবই দেখতে পেলো সেই অবয়ব । মেহেক রুমে যেতেই বাঁকা হেসে সেই অবয়বটিও চলে গেলো কোন এক অজানা উদ্দেশ্যে ।
ফিনিক্স_পাখি — পর্ব -০১
ইনায়া_আরা



0 Reviews